মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে গত পাঁচ বছর ধরে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় বন্দি রয়েছেন ৮১ বছর বয়সী নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি।
সাম্প্রতিক সময়ে তার আইনজীবীদেরও দেখা করার অনুমতি না দেওয়ায়, তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি না কিংবা কেমন আছেন—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল ও তার পরিবারের মধ্যে তীব্র জল্পনা ও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সু চির বর্তমান পরিস্থিতি এবং তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যের নানা দিক উঠে এসেছে।
গত মাসে মিয়ানমারের সাবেক রাজধানী ইয়াঙ্গুনে সু চির বাড়িতে মারা গেছে তার প্রিয় ও বিশ্বস্ত কুকুর ‘টিআইচি’। ২০১০ সালে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সু চিকে কুকুরটি উপহার দিয়েছিলেন তার লন্ডনে বসবাসরত ছেলে কিম আরিস। মায়ের স্মৃতিবিজড়িত কুকুরটির মৃত্যুর পর গভীর শোক প্রকাশ করে কিম আরিস এখন মায়ের 'জীবিত থাকার প্রমাণ' (প্রুফ অব লাইফ) আদায়ের জন্য বিশ্বনেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
২০২২ সালের শেষের দিকে জান্তার প্রহসনমূলক বিচার শেষ হওয়ার পর থেকে সু চিকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। চলতি বছরের এপ্রিলে জান্তা সরকার তাকে কারাগার থেকে গৃহবন্দি করার দাবি করলেও, কূটনীতিকদের সাক্ষাতের অনুরোধ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
কূটনীতিকদের মতে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাতিসংঘের বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠকে সু চির প্রসঙ্গ উঠলেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন জান্তা প্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। জান্তা প্রধানের এমন আচরণে আন্তর্জাতিক মহলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, সু চি হয়তো গুরুতর অসুস্থ কিংবা মৃত, যার কারণে জান্তা তার বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতে অক্ষম।
তবে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস মনে করেন, সু চির মতো বড় নেত্রীর মৃত্যুর খবর গোপন রাখা অসম্ভব। তীব্র রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণেই তাকে এভাবে বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
সামরিক জান্তা বর্তমানে আসিয়ান (ASEAN) ও জাতিসংঘে নিজেদের আসন ফিরে পেতে মরিয়া। বিশ্লেষকদের মতে, সু চিকে মুক্তি দিলে বা কূটনীতিকদের তার সাথে দেখা করতে দিলে বিশ্বমঞ্চে জান্তার সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথ সুগম হতে পারে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর মিশ্র প্রভাব রয়েছে:
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঐক্যে ফাটল: অহিংস আন্দোলনের প্রতীক সু চি অতীতে জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি কঠোর আচরণ করায় অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠী তাকে পছন্দ করে না। তার মুক্তি জান্তাবিরোধী সশস্ত্র লড়াইয়ের ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে।
জান্তর ভয় অহিংস আন্দোলনকে: বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জান্তা সরকার সশস্ত্র প্রতিরোধের চেয়ে সু চির জাদুকরি জনপ্রিয়তাকে বেশি ভয় পায়। গত ১৯ জুন তীব্র ঝুঁকির মধ্যেই সমর্থকেরা তার ৮১তম জন্মদিন পালন করেছেন।
মানবাধিকার সংগঠন ‘এএপিপি’ (AAPP)-এর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে সু চিসহ প্রায় ১৪,৫১৭ জন রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। দেশটির কারাগারগুলোর নাজুক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও তীব্র গরমের কারণে কেবল এই বছরেই জান্তার হেফাজতে ৬০ জনেরও বেশি রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু হয়েছে। অন্য বন্দিরা সুবিধা পান না বলে সু চি নিজেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেল নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
ইউ